বৃত্ত


 সবটাই কেমন পাল্টে যায়,সবটাই এক ভাবে অন্য হয়ে যেতে থাকে। এই শহর যখন আজ দুপুরের ট্রামের চাকায় গড়িয়ে চলেছে ধীরে ধীরে,পাশের বসার জায়গাটা ফাঁকা পরে আছে,ট্রামের চালকের ঘরে দুজন দাঁড়িয়ে গল্প করছে,তখন বিকেলের রোদ অন্যরকম লাগে। পাশের জায়গাটা ফাঁকা হয়ে যাওয়াই স্বাভাবিক তাহলে,এহেন পরিবর্তনই জিবতদশার নিয়ম। কতো অজস্র ছোট গল্পের এই শহর,আঁকি বুঁকী কাটে সাদায় কালোয়। সাদায় কালোয় আঁকা সত্যজিতের মুখ এই অসুস্থ শহরের মুখে একটু হাসির মতো। সমস্ত মুখে হাসি ফুটবে না,কিছু মুখ বেদনার অভিসারীও বটে। আমার কন্ডাক্টরের বোধহয় পারকিনসন্স,হাতটা কাঁপে। ওনার স্মৃতির মধ্যেই তাহলে এই ট্রামলাইনগুলো ভুলে যাওয়া যাবে তাহলে।


প্রাচীন গ্রন্থে বলে আমাদের জ্ঞান আমাদের অভিজ্ঞতার এক অবয়ব মাত্র। যাতে সময় একে একে কাটা দাগ দিয়ে যায়। কিন্তু প্রাচীন গ্রন্থের লেখক মন্ডলী বোধহয় আন্দাজ করে উঠতে পারেননি এই কাটা দাগের ইতিহাস মুছে ফেলার খেলা। এক কাটা দাগের ওপর আরেক দাগ পড়লে পুরোনোটা মলিন হয়ে ওঠে? বরং তা আরো গাঢ় হয়ে ওঠে। তথা আমাদের সমস্ত অভিব্যক্তি বা অভিজ্ঞতা এক প্রাচীন চৈতন্যের অংশমাত্র। আমরা নেহাতই কিছু ধারক বাহক। যাদের কাঁচা অবয়বের মধ্যে এক বিশাল ব্যাপ্তির দ্বিরাগমনের খেলা খেলে যায় বিশালকায় এক প্রাণ, যার হাত পায়ের বিস্তারই সংসার সেজে আমাদের ভুলিয়ে রাখে। যে চেতনার না আছে কোনো ক্ষমতা না আছে কোনো বহিঃপ্রকাশ তার অস্তিত্বের আঙিনায় আমরা সবাই এক একটা সাদা পাতা,লেখকের অপেক্ষায়। বই কি আর বই লিখতে পারে? তাই একটা অধ্যায়ের শেষে দুঃখ কি বইকে মানায়? সে তো কোনো এক অচেনা লেখকের খামখেয়াল।


সমস্ত অস্তিত্বই কি মিথ্যে তবে? এক বাহ্যিক অবয়ব হয়ে থাকার খেলা? তাহলে কিসের আর ভালবাসা,উপলব্ধি,পাওয়া না পাওয়া? মৃত্যু কি নেহাতই ব্যবহারের শেষ হয়ে যাওয়া? সমগ্র ব্যবহারের এই সামাজিকতায় তাহলে মৃত্যুশোক একান্তই অভ্যেসের বিচ্যুতির আক্ষেপ? নাকি এই বিশালত্বের খেলায় অংশগ্রহণই সেই খেলার ধারক বাহক? অর্থাৎ এই আসা যাওয়ার মাঝে এই খেলার দায়িত্বে আমাদেরই হাতে। আমরা এই খেলার গুটি নয়,আমরাই এই খেলাটা। আমাদের চৈতন্যের বসবর্তি এই বিশাল লেখকের কলম,আমরা সাদা পাতা নই,আমরা ওই কলমের কালি। যার কাটা ছেঁড়ার আঁকি বুঁকি তে সমস্তটা তৈরি। এবং সেই কারণেই মৃত্যু সহ খেলোয়ারের অনুপস্থিতির ব্যাপ্তি শোকের।


অংশগ্রহন তবে অংশকে গ্রহণ করা নয়,বরং অংশগ্রহন গুলো জুড়ে জুড়ে একটা সম্পূর্ণ তৈরি হওয়া। চরিত্রের গল্প,গল্পের চরিত্র নয়। তবু স্বমহিমা কোথায়? সবটাই তো অন্যত্রের এক নিয়মে বাঁধা, যে নিয়ম খন্ডাবার উপায় বা সুযোগ কোনোটাই নেই বা সমীচীন নয়। এক অসম্পূর্ণ চরিত্রয়নের টানা পোড়েন মাত্র,অংশের অংশবিশেষ। সেই ক্ষুদ্রতা এক বিশালত্বের মায়াজালে পাক খাচ্ছে, যাহার কোনো অন্তিম নেই,কোনো উৎস নেই। সবটাই এক গোলাকার যাত্রাপথের আগে আর পরে,যদিও সেই গোলাকার জ্যামিতির প্যাঁচ মানেনা। উৎসই অন্তিম, অন্তিমেই উৎস। সেই সমগ্র চৈতন্যের ব্যাপ্তির এক ক্ষুদ্র অংশ। যদিও সেই অংশবিশেষের অভাবে গোলাকার বৃত্তাকার চলন গমন সমান্তরালে পরিণত হয়ে মুখ লুকায়। 


ভাঙনের বিচ্যুতি সেই সমান্তরালের নিশানা। এবং সেই কারণেই শোক সামাজিকতার হিসেব নিকেষ না মেনে সবটুকু গুলিয়ে দেয়। এবং বৃত্তের বাইরে ঠেলে ফেলে দেয় অংশগ্রহণের অংশকে।


অবশ্যই এটাও মাথায় রাখার বিষয় যে নূন্যতম প্রতিরোধের পথে অগ্রসর হওয়া সর্বস্বের নিয়ম। এবং নূন্যতম প্রতিরোধের পথ সমান্তরাল নয়,বরং বৃত্তাকার। গতির ক্ষমতার বসবর্তি হয়ে ওই বিচ্ছিন্ন সমান্তরাল আবারও তার শুরু ও শেষ জোড়া লাগিয়ে এক বৃত্তে পরিণত হয়। এবং আবারও সেই গোলাকার গমনের যাত্রা পুনরাবৃত্তি হয়। ওই বিচ্ছিন্ন অংশটুকু সময়ের হাতে ওই ট্রাম কন্ডাক্টরের পারকিনসন্স এর মতোই এরম বিকেল গড়িয়ে কোনো এক সন্ধ্যের সাথে হারিয়ে যায়। আবারও সমস্তটা চেনা অভ্যেস,চেনা অবয়বের টানাপোড়েন,চেনা ছকে ফিরে যায়। যেটুকু পরে থেকে যায় ওটুকুই স্মৃতি,ওইতেই বিরহের হৃদয়বিদারক আস্ফালন। কাটা অংশের মুখের ক্ষত জোড়া লাগে দুঃখবিলাস, বা স্মৃতিচারণায়। সময়ের সাথে সবটা ঠিক হয় যায়, ক্ষতর গভীরতা বুজে আসে,আঁকি বুঁকি কাটা হয়ে যায় আরো পুরনো ক্ষতস্থানের গায়। সবটা সময়ের হাতে স্বাভাবিক ভাবে পেরিয়ে চলে যাওয়া যায়। আবারও সবটা গোলাকার এক স্বাভাবিক আশা যাওয়ার লেখনীতে ফিরে যায়।

Comments